পানিভর্তি বাথটাবে জামা খামচে ধরে বসে আছি কতোক্ষন হলো হিসেব নেই। এভাবে টুইটুম্বরভাবে ভিজে কাপড়ে থাকাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাই চেন্জ করে বেরিয়ে এলাম বাথরুম থেকে। বেরিয়ে দেখি রুমের দরজা এবারও খোলা।
পা টিপে টিপে হেটে বেরিয়ে দেখি করিডরে দুজন লোক। নিচেও আছেন দুজন। তারমানে এ বাসায় সবগুলো ছেলেমানুষ। কুচকানো কপাল নিয়ে পিছন ফিরলাম। রুমে ঢুকতে যাবো, দরজা লক। পাশে থেকেই একলোক বললেন,
-স্যার নিচে ডাইনিংয়ে যেতে বলেছেন আপনাকে। ভূতের মতো রুমের দরজা লক করে এখন নিচে যেতে বলছে। এই লোকটা সবকাজেই বাধ্য করছে আমাকে। ভয় হয়। কোনোভাবে সেরোগেশনের জন্যও যদি... না!কিছুতেই না! কোনোভাবেই রাজি হবো না আমি তার কথায় চুপচাপ নিচে নেমে আসলাম। ডাইনিংয়ে বসে মোবাইল স্ক্রল করতে থাকা রোহান ভাইয়া বললেন, -এসে গেছো আহানিতা?এসো। বসো। দাড়িয়েই রইলাম। উনি মাথা তুলে একটু তাকিয়ে থেকে জোর করে মুখে হাসি টেনে আবারো বললেন, -দাড়িয়ে আছো কেনো? প্লিজ বি সিটেড! -আপনি আমাকে নিয়ে সবটাই জানেন তাইনা ভাইয়া? উনি ভ্রুকুচকে তাকালেন। বললেন,
-সবটাই মানে?
-মানে আমাকে ঠিক কিভাবে এখানে আনা হয়েছে, কিভাবে আটকে রাখা হয়েছে, কিভাবে ট্রিট করা হচ্ছে, আমাকে কি শর্ত দেওয়া হয়েছে সবটা!
রোহান ভাইয়া ফোনে মনোযোগ দিলেন আবারো। বললেন -হ্যাঁ।
আমার কিছু প্রশ্ন আছে।
-প্রশ্ন?কিছু প্রশ্ন? তোমার তো অনেক প্রশ্ন থাকার কথা আহানিতা!
-এটা যখন বুঝেছেন তারমানে সেগুলোর উত্তর দেওয়ার সক্ষমতাও রাখেন। আমার সেসব প্রশ্নের উত্তর চাই!
-না। তোমার মতো আমিও সে প্রশ্নগুলোর উত্তর জানি না!
-আপনি জানেন! আর বলতে আপনাকে হবেই!
-আমি কিছুই জানি না আহানিতা!কি বলবো তোমাকে?
আপনি সব জানেনাঅঙ্কুর আপনার বন্ধু! আজ রুম থেকে বেরোনোতে দিয়েছেন উনি আমাকে। তাই আপনার সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। আমাকে প্লিজ.....
-অঙ্কুর নাকি তোমার সাথে আজ একসাথেই ব্রেকফাস্ট করবে। বাট আই ডোন্ট থিংক, এটা শুধু আজকের জন্যই আই থিংক এরপর তোমাকে আর রুমে লক করে রাখবে ও! তাচ্ছিল্যে হাসলাম। বললাম,
-তাই নাকি? রুমে লক করে রাখবে না। বরই সুসংবাদ শোনালেন!
-তোমার লাইফের আরো অনেক সুসংবাদদাতা হওয়ার ইচ্ছে
আছে আমার আহানিতা আফটার অল, ভাইয়া বলে
ডেকেছো!
-যদি তাই হয়ে থাকে, যদি সত্যিই বোন ভেবে থাকেন
আমাকে, তাহলে এটুকো বলুন, আমাকে কেনো এখানে
আটকে রাখা হয়েছে? এসব উল্টোপাল্টা শর্ত কেনো..
-জাস্ট আ মিনিট আহানিতা! একটু শ্বাস নাও!
-
তুমি তো একদম সাংবাদিকদের মতো জেরা করতে শুরু করলো অঙ্কুর ঠিকই বলেছে, তোমার সাথে কথা বলাটা রিস্কি! মুখ ফিরিয়ে নিলাম। উনি বললেন,
-রিল্যাক্স! বসো আগে!
৭ চেয়ার টেনে বসলাম। রোহান ভাইয়া আবারো বললেন,
-একটা কথা বলো তো আহানিতা, অঙ্কুর তোমাকে অদ্রি কেনো ডাকে?ওটাও তোমার নাম?
-না। আমি অদ্রি নই।জানিনা কার সাথে গুলিয়ে ফেলেছেন উনি আমাকে! আবোলতাবোল বকা, আবোলতাবোল নামে ডাকার রোগে ভুগছেন উনি। হি ইজ সিকা মুচকি হাসলেন রোহান ভাইয়া। বুঝলাম, উনি কথা বাড়াতে চান না আমার সাথে। তাইএসব প্রশ্ন তুলছেন। এরমধ্যে অঙ্কুরের হুইস্টিংয়ের শব্দ। মাথা তুলে তাকালাম। মেরুন টিশার্ট পরেছেন উনি এবার। ভেজা চুল। গলায় তোয়ালে ঝোলানো। চোখাচোখি হতেই চোখ সরিয়ে নিলাম। উনি সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে বললেন,
-যা দেখছি, বেশ পেটুক মানুষ আপনি মিস অদ্রি! যেইনা বলেছি খাবার আর আপনার ঘরে যাবে না,সুরসুর করে ডাইনিংয়েই হাজির হলেন ব্রেকফাস্ট করতে। কেয়া বাত! ৭ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালাম আমি। অঙ্কুর সোজা আমার সামনে এসে দাড়িয়ে গেলেন। শক্ত চোখে তাকিয়ে রইলাম তারদিকে কতোক্ষন। উনি মৃদ্যু হাসি নিয়ে চুপ করে রইলেন
-পাশ কাটিয়ে চলে আসছিলাম । উনি পেছন থেকে বলে উঠলেন আপনার ঘরে তোয়ালে ছিল
-মিস অদ্রি মাথাটা মুছেননি ঠিকমতো?
চুলে পানি রয়েছে পুরোটাই ।আর খাবার খেয়ে চলে যাচ্ছেন যে কোনো ভাবে আপনি চাচ্ছেন অসুস্থ হতে? হসপিটালাইজড্ হতে? কোনোভাবে আমাকে এটা বোঝাতে চাচ্ছেন না তো?আমার শর্তে আপনি রাজি? পা থেমে গেলো আমার। গটগট করে আবারো এসে এককোনের একটা চেয়ারে বসে গেলাম। অঙ্কুর এগোলেন আমার দিকে। আমার তীক্ষ্মদৃষ্টিকে পাত্তা না দিয়ে গলায় থাকা তোয়ালেটা আমার মাথায় দিয়ে টেবিলের আরেকপ্রান্তে গিয়ে বসলেন উনি। বিশাল ডাইনিং টেবিলটার সবচেয়ে আলিশান চেয়ারটা ফাকা রাখা। তারই পাশের এক চেয়ারে বসে গেলেন অঙ্কুর। তার একদম পাশের চেয়ারটায় রোহান ভাইয়া। দুজন লোক এসে খাবার বাড়তে লাগলো। অঙ্কুর বললেন,
-মাথা ঠিকমতো মুছুন মিস অদ্রি! উঠে দাড়িয়ে একটু সরে দাড়ালাম। মাথা মোছা মুলত বাহানা। আড়চোখে পুরো বাসা দেখতে লাগলাম। সদর দরজাটা চোখে পরেছে। আটকানো। এপাশে কেউ পাহাড়ায় নেই। বাইরে আছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। অঙ্কুর চামচ নাড়তে নাড়তে বললেন,
-বাসার চারপাশে, ভেতরে, বাইরে সবখানেই গার্ডস্ আছে মিস অদ্রি পালানোর রাস্তা স্ক্যান করা শেষ হলে প্লিইইইইজ ফিনিশ দ্যা ব্রেকফাস্ট! আবারো খেতে বসলাম। রোহান ভাইয়া অঙ্কুরের পাশেই বসে খাচ্ছেন। অঙ্কুর খাওয়া শেষ করে মুখ মুছে উঠে দাড়ালেন। বললেন, -রোহান তুই বাসায় যাবি?
হুম অফিসে যাবো বাসা থেকে ই
আর এই যে মিচ পাহাড় পর্বত,,
মাথা তুলে কপালে ভাজ ফেলে তাকালাম তার দিকে। উনি একগাল হেসে বললেন,
-ছোটবেলায় ব্যকরন ক্লাসে ফাকি দেননি তারমানে। সমার্থক শব্দটা ভালোই পড়েছেন দেখেছি! কটমটে চোখে তাকিয়ে রইলাম শুধু। অঙ্কুর বললেন,
-শুনুন মিস এভারেস্ট! আমি ক্লাবে যাচ্ছি। প্র্যাকটিস আছে। কখন ফিরবো জানি না। আর রোহানও বেরোবে। হুইচ মিনস্, বাসায় আমি বাদে মোটামুটি বাকি তিনজন সার্ভেন্ট, দুজন মালি, দুজন দাড়োয়ান আর বারোজন গার্ডস্ এর নজরে থাকবেন আপনি শুধু। সব মিলিয়ে মাত্র উনিশজন। এছাড়া কোনায় কোনায় লাগানো সিসিক্যামগুলো হিসেবের বাইরে রাখলাম। ওগুলোতে যে আপনি সবসময় আমার নজরে থাকবেন, ওটা আলাদা করে নাইবা বললাম। মরাল অফ দ্যা স্টোরি ইজ, আপনি যতোচেষ্টাই করুন না কেনো, এ বাসা থেকে বেরোতে পারবেন না। তাই একটু শান্তশিষ্ট স্বভাব দেখানোর চেষ্টা করবেন। চড়ুইয়ের মতো বেশি লাফালাফি করবেন না কেমন?হ্যাভ আ নাইস ডে!
উনি রুমের দিকে পা বাড়ালেন। রাগে কাটা চামচে প্লেটেই ঘা লাগালাম। রোহান ভাইয়া ওখানেই বসে। অনেকটা সময় পর বললেন,
-তুমি অঙ্কুরের কথায় রাজি হচ্ছো না কেনো আহানিতা? বিস্ময়ে তাকালাম তারদিক। পরপরই নিজেকে সামলে নিলাম। ওনাকে ওনার বন্ধুর থেকে আলাদা ভাবা আমারই বোকামি ছিলো। বললাম,
-সার্থক আপনাদের বন্ধুত্বাসবটা জেনেবুঝেও আপনিও আপনার বন্ধুকে সাপোর্ট করছেন।হাহ! -কোনো ভুল কাজকে সমর্থন করিনি!
-হ্যাঁ বুঝেছি।
পর্ব ৭ ফেসবুকে
