ইশান মীরার হাতে টেডিবিয়ার দিয়ে মীরার মাথায় হাত রেখে বলল, চিন্তা করিস না মীরু আমি বড় হলে তোকে একদিন নিয়ে যাব আমার কাছে।'
মীরা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, আর মনি'মা কে নেবে না??' সাথে সাথে ইশান রেগে গেলো বলল, নাহ আমার মা খুব খারাপ মীরু। মা আমার বাবাকে একটুও লাভ করে না।' 'না ইশান ভাইয়া মনি'মা খুব ভালো। ওই আঙ্কেলটা খুব পঁচা।ই এখন ছোট মীরু তাই কিছু বুঝতে পারছিস না।
বড় হলে ঠিকই বুঝবি।'
মীরা নাক ফুলিয়ে বলল, তুমি বুঝি বড়?? মনি'মা তো সবসময় বলে তুমিও ছোট।'
ইশান কিছু বলার আগেই ইফাজ ব্যাগ নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে আসে সাথে পিহু ও। পিহু কাঁদতে কাঁদতে বলল,'প্লিজ ইফাজ রাগের মাথায় কোন ভুল সিদ্ধান্ত নিও না। সব চোখের দেখা সত্যি হয় না।'
ইফাজ পিহুর দিকে ফিরে তাকিয়ে বলে,'সব চোখের দেখা যেমন সত্যি হয় না। তেমনি সব চোখের দেখা মিথ্যা ও হয় না। আমি নিজের চোখে না কোন মিথ্যা দেখেছি আর না শুনেছি।'
পিছ এবার ঝেড়ে গলায় বলল, তুমি এভাবে ইশানকে নিয়ে যেতে পারো না। ইশান আমারও ছেলে। তোমার যেমন ইশানের উপর অধিকার আছে তেমনি আমার ও আছে।' ইফাজ সহজ গলায় বলল, ওহ আচ্ছা?? তাহলে ইশানকে জিজ্ঞাসা করো সে কার সাথে থাকতে চায়??'
পিহু ইশানের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ওর হাত ধরে
বলল, ইশান তুমি প্লিজ মা'কে ভুল বুঝো না। সত্যি তোমার
কিছুই করেনি। তুমি যেও না ইশান। তোমাকে ছাড়া মা
থাকতে পারবে না। প্লিজ তোমার আব্বুকে একটু বলো।' ইশান পিছর থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, 'আমি ছোট নই আম্মু আমি সবটা বুঝি।
তুমি কেন করলে এরকম আম্মু?? আব্বু তো তোমাকে কতো লাভ করে তারপরও তুমি কেন এমন করলে??আই হেট ইউ আম্মু আই হেট ইউ। আমি আব্বুর সাথে চলে যাবো। তোমার সাথে থাকবো না।'
ইশান দৌড়ে ইফাজকে জড়িয়ে ধরলো। ইফাজ তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, দেখলে তো এইটুকু ছেলেও সব বোঝে। তুমি সত্যি খারাপ মা। আর একজন খারাপ মায়ের কাছে আমি আমার ছেলেকে রেখে যেতে পারি না। বাড়ি গাড়ি টাকা পয়সার প্রতি যে তোমার এতো লোভ তা আমি আগে জানতাম না। আমার কি কম ছিল পিছ?? জীবনে কি টাকা পয়সা সব?? ভালোবাসার কোন মূল্য নেই তোমার কাছে?? তাই তো আজ নেহালের টাকার প্রতি তুমি আকৃষ্ট হয়েছো। তবে তাই হোক। তুমি নেহালের সাথেই থাকো। আমি বাঁধা দেব না।
আর হ্যা ডিভোর্স পেপার শিঘ্রই পেয়ে যাবে। তারপর তোমার
সব রাস্তা পরিষ্কার। আর কেউ তোমার পথে বাধা হয়ে
দাঁড়াবে না।'
ইফাজ ইশানের হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। পিহু মেঝেতে বসে চিৎকার দিয়ে কাঁদছে আর বলছে, এভাবে ইশানকে আমার থেকে নিয়ে যেও না ইফাজ। তুমি আমাকে ভুল বুঝছো।
সব চোখের দেখা সত্যি হয় না। একবার আমার কথা শুনে যাও ইফাজ।'
ইফাজ ততক্ষণে চলে গেছে। ছোট্ট মীরা ও এবার কাঁদছে
পিছর কান্না দেখে। দৌড়ে এসে সে পিছর কোলে ঝাঁপিয়ে
পড়লো। পিহু তখন জোরে জোরে কাঁদছে আর বিলাপ করছে,,,
করছে। বারবার ইফাজকে ফিরে আসতে বলছে। মীরা পিছর চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল, 'তুমি কেঁদো না মনি'মা। আমারও খুব কান্না পাচ্ছে। একবার আমার আম্মু ফিরে আসুক তারপর দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। আম্মুকে বলে ইশান ভাইয়া আর ভালো আব্বুকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবো দেখো। তুমি কেঁদো না। তুমি কাঁদলে আমার খুব কষ্ট হয়।'
মীরার কথা পিছকে আরও দূর্বল করে দিলো। বুকের মাঝে শক্ত করে চেপে ধরলো মীরাকে। মীরাকে ধরেই সে কাঁদতে লাগলো। ছোট্ট মীরা পিছর কষ্টটা বুঝলো কিন্তু ওর স্বামী আর ছেলে তা বুঝলো না। এতে পিছর আরো কষ্ট হচ্ছে। মীরাও সমান তালে কেঁদে চলেছে পিছর সাথে। পনেরো বছরের সম্পর্ক এক নিমিষেই শেষ হয়ে গেল।
ইফাজ আর পিছ ভালোবেসে বিয়ে করেছিল। পিহু ছিল নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ে। বাবা ছোটবেলায় মারা গিয়েছে। মা গার্মেন্টসে চাকরি করে পিছকে মানুষ করেছে। পিহুও দমে যায় না নি। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করতো। তারপর কিন্ডারগার্ডেন স্কুলে চাকরি নিয়ে নিজের পড়াশোনা আর সংসার চালাতে লাগলো। ভার্সিটিতে পা দিয়ে তার ইফাজ খানের সাথে পরিচয় হয়। ইফাজ পিহর সিনিয়র ছিলো। পিহুর সৌন্দর্য আর সাধারণ চলাফেরা ইফাজকে মুগ্ধ করে।
একটা সময় ইফাজ পিছকে প্রপোজ করে। কিন্তু পিহু রাজি হয় না। কারণ ইফাজ অনেক বড় ঘরের ছেলে। ইফাজের বাবার বড় বড় ব্যবসা আছে দেশে বিদেশে। পিহুর মতো সামান্য একটা মেয়ের সাথে ইফাজের যায় না। কিন্তু ইফাজের পাগলামির কাছে হার মানে পিছ। বাধ্য হয় ইফাজের প্রেমে সাড়া দিতে। ওদের ভালোবাসা আস্তে আ গভীর হয়ে যায়। ভার্সিটিতে ওরা বেস্ট কাপল হিসেবে
আখ্যায়িত হয়। তবে কিছু কিছু মেয়েরা পিহুকে হিংসা করতো। কারণ ইফাজ খান এতো সুন্দর স্মার্ট হয়ে কিভাবে এরকম নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট হলো।
এতে ইফাজের কোন মাথাব্যথা ছিল না। তবে সমস্যা হলো ইফাজের পরিবার নিয়ে। ইফাজের বাবা মা কিছুতেই পিহুর সাথে তাদের ছেলেকে বিয়ে দেবেন না। ইফাজ তাদের একমাত্র সন্তান। তারা তাদের ছেলেকে অনেক বড় ঘরে বিয়ে করাবেন। মেয়েও ঠিক করে ফেলেছিলেন। কিন্তু ইফাজের জেদের কাছে তাদের সিদ্ধান্ত কিছুই না। অতিরিক্ত বদমেজাজি আর জেদি ছেলে ইফাজ। যা বলে তাই করে ছাড়ে। এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। পিছর হাজার বারণ সত্ত্বেও তাকে বিয়ে করে নিয়ে এসে হাজির হয় বাড়ির কাঠগড়ায়।
পিছকে সে এক প্রকার জোর করেই বিয়ে করছে। পিছ ইফাজের কথা ফেলতে পারেনি। ভালোবাসা তার এতই গভীরে গিয়ে পৌঁছেছিল যে ইফাজের প্রতিটা কথা শুনতে সে বাধ্য।
কিন্তু দুঃখের বিষয় যে খান বাড়ি থেকে সেদিন ইফাজ আর পিহু ফিরে এসেছিল। কারণ ইফাজের বাবা তাদের ঢুকতে দেয়নি খান বাড়িতে। বলেছিলেন যদি ইফাজ পিহুকে ছেড়ে দেয় তবেই সে খান বাড়িতে যেতে পারবে। কিন্তু জেদি ইফাজ তা করেনি। পিছকে নিয়ে ওর বাসায় চলে আসে।
তারপর থেকে ইফাজ আর পিহুর ছোট্ট সংসার শুরু হয়। কষ্ট হলেও মানিয়ে নেয় পিছ।
ইফাজ কয়েকমাস চেষ্টা করে ছোট একটা চাকরি পায়। আর পিছ তো স্কুলে চাকরি করে। কোনমতে চলে যায় ওদের। দিনশেষে যখন ইফাজ ক্লান্ত হয়ে বাড়িতে ফেরে পিহু
নিজ হাতে ঠান্ডা পানি এগিয়ে দেয়। সযত্নে ইফাজের ঘাম মুছে দেয়। ইফাজের বুকে মাথা রেখে শান্তি পায় পিহু। ইফাজও নিজের প্রেয়সিকে জড়িয়ে ধরে রাত পার করে দেয়।
ওদের জীবনে আরেক খুশির খবর আসে যখন পিহু প্রেগন্যান্ট হয়। ইফাজ সেদিন খুব খুশি হয়েছিলো।
একদফা পিহুক কোলে নিয়ে ঘুরেছিল। বাবার হওয়ার খুশিতে সবাইকে মিষ্টি মুখ করিয়েছিলো। সবসময় পিহুর যত্ন করতো ইফাজ। তাছাড়া পিহুর মা তো আছেই।
যেদিন পিহুর ভেলিভারি হলো সেদিন হসপিটালের করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিল ইফাজ। সর্বপ্রথম ইফাজ ইশানকে কোলে তুলে নিয়েছিল। ইশানকে কোলে রেখেই পিছর কপালে গভীর চুম্বন করেছিলো।
ওদের বিয়ের সাড়ে এগারো বছর আর প্রেমের সম্পর্ক ছিল সাড়ে তিন বছর। এই নিয়ে মোট পনেরো বছরের সম্পর্ক ওদের। আর আজ এক নিমিষেই সব শেষ হয়ে গেছে।
এসব ভাবতে ভাবতেই পিহুর চোখে পানিতে ভরে গেল। এখনো সে দরজার সামনে বসে আছে। এই বুঝি ইফাজ ইশানকে নিয়ে ফিরে আসবে। এই বুঝি ইশান আম্মু আম্মু বলে ঝাঁপিয়ে পড়বে ওর কোলে। কিন্তু ওর ভাবনা সত্যি হলো না। ইফাজ এলো না ইশানকে নিয়ে।
ছোট্ট ইশান মাকে ছাড়া থাকবে কিভাবে??পিছ সেসব ভেবেই কাঁদছে। এমন সময় এক জোড়া পা এসে থামল পিছর সামনে। বুট পরা পায়ের মালিকের দিকে তাকালো সে। মালিককে দেখেই রাগে কাঁপতে লাগলো পিহুর সারা শরীর। নেহাল হেসে তাকালো পিছর দিকে। তারপর এক ঝটকায়
পিহুর হাত ধরে দাঁড় করালো। পিহুর কোল থেকে ছিটকে