গল্প সবটাই তুমি পর্ব ২৪

 ঘুমের ঘোরে অনুভব হলো কেউ কপাল আলতোভাবে ছুইয়ে দিচ্ছে আমার। হালকা বাতাসে চোখের উপর বারবার চুল এসে পরায় বিরক্ত লাগছিলো। কিন্তু আমি সরানোর আগেই সেগুলো সরে যাচ্ছিলো। চোখও ভারী লাগছিলো। তাই না তাকিয়ে আরো গুটিশুটি মেরে শুয়ে রইলাম। একসময় একদম চোখ বরাবর আলো পরায় ঘুমটাই ভেঙে গেলো। আধখোলা চোখে দেখতে পেলাম জানালার কাছের দেয়ালে একপা ঠেস দিয়ে পিঠ ঠেকিয়ে দাড়িয়ে কেউ।


আবছা অবয়বটা দেখেই ধরফরিয়ে উঠে বসলাম। জানালাটা খোলা। একপাশে গুটিয়ে রাখা পর্দা বাইরের বাতাসে উড়ছে। বাইরের জোসনার আলো জানালা দিয়ে যতোদুর সম্ভব ঘরে ঢুকেছে। আধখোলা দরজা দিয়ে বাইরে থেকে আসা একফালি আলো আর জানালা দিয়ে আসা চাদের আলোতে সে অবয়ব স্পষ্টভাবে জানান দিলো, সে অঙ্কুর। বুকে হাত গুজে একহাত থুতনিতে দিয়ে মিটমিটিয়ে হাসছে সে। তারদিক তাকিয়েই বিছানা হাতড়াতে লাগলাম আমি। অঙ্কুর এগিয়ে এসে পকেটে দুহাত গুজে আরামে দাড়ালেন। বললেন,


-আরেকটু ডানপাশে। বিছানায় তাকালাম। সত্যিই হাতের ডানে চশমাটা। ওটা চোখে দিয়ে আরেকবার ফিরলাম তারদিকে। উনি অকপটে বললেন, -তোমার ঘুম নষ্টের জন্য আমি দায়ী নই অদ্রি। এসে দেখি কপালে বিন্দুবিন্দু ঘাম জমেছে তোমার। আমারও গরম লাগছিলো। তাই ভাবলাম জানালা খুলে দেই। বাতাসের জন্য পর্দাটাও সরিয়ে দিয়েছি। ওর দোষটা তো কাটিয়েই


দিচ্ছিলাম। কপালের চুলগুলো তোমাকে জাগানোর আগেই কিন্তু আমি সরিয়ে দিয়েছি। এবার বাতাসের সাথে সাথে চাদের আলোটাও ঘরে ঢুকলে আর সে আলো তোমার চোখে পরে তোমার ঘুম ভেঙে গেলে, আমার কি দোষ বলো? -কেনো এসেছেন এ ঘরে?



-তুমি কোথায় ঘুমোবে সে সিদ্ধান্তটা যেমন আমার উপর ছাড়োনি, আমি কোথায় যাবো তার কারন জানারও কোনো অধিকার নেই তোমার।


মাথার উপর চাদর টেনে সটান হয়ে শুয়ে পরলাম আবারো। অঙ্কুর বললেন,


-মুখ ঢাকছো যে!


-আমার ইচ্ছা।


আর কোনো আওয়াজ আসেনি। এদিকে ঘুমও আসছে না আমার। আস্তেধীরে চাদর সরিয়ে দেখি অঙ্কুর আবারো জানালার ধারে দেয়ালে একপা ঠেস দিয়ে বুকে হাত গুজে


দাড়িয়েছেন। জোরে একটা শ্বাস ফেলে বললাম, -যাচ্ছেন না কেনো আপনি? নিজের রুমে গিয়ে ঘুমোন!


-তোমার কথায় চলতে হবে আমাকে?


গটগট করে উঠে এসে অঙ্কুরের ঘরে তার বিছানার একপাশে কাত হয়ে শুয়ে পরলাম। একটু পরে বিছানা নড়ে উঠতেই টের পেলাম উনিও এসেছেন। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই অঙ্কুর বড়সর হেসে বললেন,


-গুড নাইট।


কিছু না বলে মুখ ফিরিয়ে নিলাম। চোখ বন্ধ করে জোর করে ঘুমোনোর চেষ্টা করতে থাকলাম অনবরত।


ঘুম ভেঙেছে খুব ভোরে। চোখ মেলে অঙ্কুরের ঘুমন্ত মুখটাই আগে দেখেছি। দুজনের মাঝে রাখা কোলবালিশটায় হাত


রেখে মুখ গুজে শুয়ে আছেন উনি। উঠে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। রুম থেকে বেরিয়ে নিচে নেমে এসেছি। কল লাগালাম তানহার ফোনে। রিসিভ করে ও শান্ত গলায় বললো,


-বল।


-বলবি তো তুই। কেমন আছিস?


-ভালো। তুই?


-হ্যাঁ ভালো। তিহান......


-কিছু বলছিস না কেনো?কি হয়েছে?


-আজ থেকে জয়েন করছে ও। পাপা ওকে একদম এমডি বানাতে চেয়েছিলো। আমিই মানা করেছি। যদি একবারও ওর মনে হয় ওটা ওর যোগ্যতার বাইরে, ভাববে পাপা দয়া করছে ওকে। মানা করে দেবে ও। আবারো আমাকে অপমান করবে। তাই আমিই পাপাকে বলেছিলাম, ওকে সাধারন কোনো জব অফার করতে। হয়ে গেছে ওর চাকরিটা। তাছাড়া ওর ভার্সিটির ক্লাসটাইম নিয়েও পাপা ভেবেচিন্তে কাজ দেবে ওকে এটাও বলেছে।


চোখ বন্ধ করে স্বস্তির শ্বাস ফেললাম একটা। তানহা বললো,


-ওদিকের কি খবর? ফাইলগুলো পেয়েছিস?


-না।


-এএসএ কোনোভাবে তোকে জোর করেছে আনু? -না।


-তোর এখনও মনে হয় তোকে শাস্তি দিতে চায় সে?


চুপ রইলাম। জবাব দেওয়ার কিছু খুজে পাচ্ছিলাম না।


অঙ্কুরের কিছু অদ্ভুত কথা আর ব্যবহার এর কারন। কখনো কখনো তার ব্যবহারগুলোতে হারিয়ে যাই আমি, ভুলে যাই, ঠিক কারনে কি ঘটছে। তার কাজকর্মের গোলকধাধায়


পরে যাই। কিন্তু পরপরই তার অসৎ কাজগুলোর কথা তিনিই


মনে করিয়ে 

দেন আমাকে। তানহা আবারো বললো,


-বল আনু?তোর এখনো....


-মনে হওয়াটা আসল কথা নয় তান্নু।


-কেনো নয়? দেখ! যদি কোনোভাবে তোর মনে হয় সে তোর আলাদা কেয়ার করে, তোকে আলাদা চোখে দেখছে, তোর জন্য সে ব্যস্ত, তোকে ভালোবাসে সে, তবে....


-ভালোবাসা?হাহ!এটা কেনো উচ্চারন করলি তুই?এই শব্দটা ওনার সাথে যায় না রে! বেবি নিয়ে ওনার কথা না বলাটা আসল কথা নয়। উনি কেয়ার করেন আমার, জোর করেননি, কিছু কিছু কথা কাজে দুর্বল করে দিতে চান আমাকে, নাইবা এগুলো আসল কথা। আসল কথা হলো, উনি বিয়ের জন্য বাধ্য করেছিলেন আমাকে। উনি প্রদীপ সরকারের সাথে জড়িত। টাকার বিনিময়ে নিজেকে বিক্রি করে দিয়েছেন উনি। ওনার বাবা আমার বাবা মার মৃত্যুর সাথে সম্পৃক্ত। উনি এখন যা যা করছেন, সবটাই আমাকে দুর্বল করে দেবেন বলে। আর এগুলোর ভীড়ে তার প্রতি আমার ঘৃনাটাই জন্মেছে। ঘৃনাটাই থাকবে। তার কথা, কাজে অদ্রি কখনোই দুর্বল হয়ে লক্ষ্যচ্যুত হবে না। কোনোদিন না!


-তোমাকে লক্ষ্যচ্যুত করার ইচ্ছা আমার কোনোদিনও ছিলো না অদ্রি। তবে আফসোস! তুমি নিজেই নিজের কাছে হেরে গেছো। একদম বোল্ড আউট!


ব্যাগ কাধে করে সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে কথাটা বললেন অঙ্কুর। ফোন কান থেকে নামিয়ে নিলাম আমি। ঠিক কতোটুকো শুনেছেন অঙ্কুর, সেটাই ভাবনার বিষয়। উনি


ডাইনিং টেবিলে রাখা জুসের গ্লাস শেষ করে সোজা আমার



সামনে এসে দাড়িয়ে গেলেন। আমার ওড়না টেনে মুখ মুছে বললেন,


-টার্গেট নিয়ে কথা বলছিলে, তারমানে অবশ্যই আমাকে নিয়ে কথা হচ্ছিলো তাইনা? যেহেতু প্রমান নেই তোমার কাছে, ফোনের ওপাশে মিডিয়ার কেউ নয়। আর আস্থা, তিহান মনিমাকে তো বলবেই না। আ'ম ড্যাম শিওর, ওটা তানহা। তার সামনে ফোন তুলে কলটা কেটে দিলাম। তানহার নাম দেখে ওনার হাসি প্রসারিত হলো। চোয়াল শক্ত করে দাড়িয়ে রইলাম আমি। উনি আরেকটু এগিয়ে বললেন,


-মেয়েদের রাগে না, কোমলতায় মানায় অদ্রি। এই যে রাগের


মুশোখ পরে নিজেকে স্ট্রং দেখানোর চেষ্টা করছো, এর


কোনো প্রয়োজন নেই। আমি চিনে গেছি তোমাকে। আমার


কাছে তোমার পরিচয়, তুমি একটা মেয়ে, যে আর পাঁচটা


সাধারন মেয়ের মতোই নিজের মনের সুপ্ত অনুভূতির কাছে


দুর্বল। ভয় পায়। তাদের ফেইস করতে। ইউ নো হোয়াট? কখনো


কখনো মনে হয়, না চিন্তা হয়, যখন সেই অনুভূতিগুলো


মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, তোমার কি হবে? কিভাবে সামলাবে


নিজেকে?


-রাগ, ঘৃনার যথাযথ কারন আছে আমার অঙ্কুর। এগুলোই যথেষ্ট, আপনার এগেনিস্টে সবটা জোগাড় করে সবাইকে সবটা জানানোর জন্য। আর এমনটাই হবে।


উনি বাকা হেসে বললেন,


-টাইম উইল সে মিসেস পর্বতশৃঙ্গ! এনিওয়েজ, স্পোর্টস্ ক্লাবে যাচ্ছি। প্র্যাকটিস আছে। কখন ফিরবো, জানি না। যেকোনো


দরকারে নায়েব কাকাকে বলো হুম? গুড ডে! এটুক বলেই সানগ্লাসটা চোখে পরে হুইস্টলিং আর কাধের ব্যাগ টানতে টানতে বেরিয়ে গেলেন উনি। গোধুলীর ছোয়ায় ধরনী লালচে হয়ে আছে। ছাদে দাড়িয়ে পশ্চিমের দুরের গাছপালা আর দালানকোঠার ফাকে আড়াল হতে দেখছিলাম সূর্যটাকে। রেলিংয়ে হাত রেখে একধ্যানে তাকিয়ে ছিলাম সেদিকেই। হঠাৎই পেছন থেকে দুটো হাত রেলিংয়ে রাখলো কেউ। সে দুহাতের মাঝে বাধা পরে চোখ বন্ধ করে নিলাম। আগেরদিনের মতো আজও স্পর্শ নেই শরীরে আমার। তবুও অঙ্কুরের নিশ্বাস অনুভব করতে পারছিলাম। উনি বড় একটা শ্বাস নিয়ে বললেন,


-আকাশ!


শব্দটা শুনেই বাবার কথা মনে পরে গেলো আমার। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠেছে। অঙ্কুর বললেন, -অদ্রি?তুমি তো রিপোর্টার। জার্নালিজমে ভালোই আনাগোনা তোমার। আকাশ ইলিয়াস আর অনিতা মেহরানকে চেনো? শ্বাস দ্রুততর হতে লাগলো। এসব কেনো জিজ্ঞাসা করছেন উনি আমাকে? অঙ্কুর আবারো বললেন, -বলছো না যে? ওনাদের নাম শুনেছো নিশ্চয়ই?


আড়চোখে তাকালাম ওনার দিকে। উনি মাথা নাড়িয়ে উত্তর চাইলেন আবারো। ভেতরটা আরো বেশি ধুকপুক করতে লাগলো। বুঝে উঠতে পারছি না কি জবাব দেবো। চিনি বললে তাদের নিয়ে আমার আগ্রহ সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন অঙ্কুর। চিনি না বললে হয়তো এটা নিয়েও আমাকে সন্দেহ করবেন। সন্দেহের তালিকায় থাকার চেয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াই শ্রেয়।


বললাম,


-হ্যাঁ। নাম শুনেছি। কে না চেনে তাদের? সাহসিকতার জন্য।


আর এই সাহসিকতার জন্যই মরতে হয়েছিলো তাদের। -আমি যতোদুর জানি, ইট ওয়াজ এন এক্সিডেন্ট। তুমি তো এমনভাবে বলছো যেনো, এটা মার্ডার ছিলো!


-এ দেশের সাংবাদিকজগত কখনোই মানে নি এটা এক্সিডেন্ট ছিলো, মানবেও না। আমি কেনো স্রোতের বিপরীতে গা ভাসাবো?


-কারন তুমি তো ইউনিক, বাকিদের মতো নও! বাই দ্যা ওয়ে, তোমার ইচ্ছা করে না ওনাদের মৃত্যুরহস্য নিয়ে রিপোর্ট লিখতে?


-না।


অঙ্কুর তার হাতদুটো সরালেন। পিছন থেকে সরে গিয়ে পাশে দাড়ালেন আমার। সোজা সামনে তাকিয়েও বেশ বুঝতে পারছি, তার চেহারায় বিস্ময়। মৃদ্যু হেসে বললাম,


-ইচ্ছা করে তাদের মৃত্যুর জন্য দায়ী প্রত্যেককে নিজ হাতে শাস্তি দিতে!


-তুমি তো এমনভাবে বলছো, যেনো তুমি চেনো, তাদের খুনি


কে?


-তাদের চিনলে এতোদিনে তারাও অদ্রির হাতে খুন হয়ে যেতো!


অঙ্কুর আমার হাতের কনুইয়ের উপর দিকটা ধরে ফেরালেন


তারদিকে। শান্তভাবে বললেন





Post a Comment

Previous Post Next Post